হিজামার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
হিজামা বা কাপিং থেরাপি একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি, যা আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখনও বহুলাংশে বিতর্কিত (Controversial)। প্রচলিত বিশ্বাস ও এর দাবিকৃত উপকারিতাগুলিকে আধুনিক বিজ্ঞান কীভাবে ব্যাখ্যা করে বা কেন অস্বীকার করে, তার একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।
হিজামার (কাপিং থেরাপি) বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
হিজামার মূল প্রক্রিয়া হলো ত্বকের উপর কাপ স্থাপন করে শূন্যস্থান (Vacuum) তৈরি করা। এই শূন্যস্থান ত্বকের নিচের অংশকে টেনে ধরে। ভেজা হিজামার (Wet Cupping) ক্ষেত্রে ত্বকে ছোট ছেদ তৈরি করে রক্ত বের করা হয়।
১. দাবি করা উপকারিতার পেছনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া
ঐতিহ্যগতভাবে হিজামার যে উপকারিতাগুলি দাবি করা হয়, বিজ্ঞানীরা সেগুলির ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য কয়েকটি প্রক্রিয়া অনুমান করেন, যদিও এর কোনোটিই সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়:
ক. রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি (Increased Blood Circulation)
ব্যাখ্যা: কাপিংয়ের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান ত্বকের নিচের রক্তনালীগুলিকে (Capillaries) প্রসারিত করে। এর ফলে ঐ নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত প্রবাহ তীব্রভাবে বেড়ে যায়। উন্নত রক্ত সঞ্চালনের কারণে পেশী এবং টিস্যুগুলিতে অক্সিজেন ও পুষ্টির সরবরাহ বাড়ে।
ফলাফল: এই কারণে জমে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড বা অন্যান্য মেটাবলিক বর্জ্য দ্রুত অপসারণ হতে পারে, যা পেশীর ব্যথা ও টান কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।
খ. ব্যথার গেট নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব (Gate Control Theory of Pain)
ব্যাখ্যা: এটি একটি স্নায়ু-শারীরবৃত্তীয় (Neurophysiological) তত্ত্ব। কাপিংয়ের মাধ্যমে ত্বক ও পেশীতে যে যান্ত্রিক উদ্দীপনা (Mechanical Stimulation) তৈরি হয়, তা ব্যথার সংকেত বহনকারী ছোট স্নায়ু ফাইবারগুলির সংকেতকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
ফলাফল: সহজ কথায়, কাপিংয়ের টান ও চাপের অনুভূতি মস্তিষ্কে ব্যথার মূল সংকেত পৌঁছানোর পথ সাময়িকভাবে 'বন্ধ' করে দেয়, ফলে রোগী তাৎক্ষণিক ব্যথামুক্তি অনুভব করেন।
গ. প্রদাহজনক এবং রোগ প্রতিরোধক প্রতিক্রিয়া (Inflammatory and Immune Response)
ব্যাখ্যা: ভেজা হিজামার সময় ত্বকে যে ক্ষুদ্র আঘাত বা ছেদ তৈরি হয়, শরীর সেটিকে এক ধরনের 'ক্ষুদ্র ট্রমা' হিসেবে চিহ্নিত করে। এর প্রতিক্রিয়ায়, শরীর ঐ স্থানে রোগ প্রতিরোধক কোষ (যেমন শ্বেত রক্তকণিকা) এবং প্রদাহজনক সাইটোকাইনস পাঠায়।
ফলাফল: কিছু গবেষক মনে করেন, এই স্থানীয় প্রতিক্রিয়া সামগ্রিকভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে উদ্দীপিত করতে পারে।
২. 'টক্সিন বা দূষিত রক্ত' দূর করার দাবির বৈজ্ঞানিক অস্বীকার
হিজামার সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় দাবি হলো এটি শরীর থেকে 'দূষিত রক্ত' বা 'বিষাক্ত পদার্থ/টক্সিন' বের করে দেয়। আধুনিক বিজ্ঞান এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করে এবং এটিকে ভুল ধারণা (Myth) হিসেবে চিহ্নিত করে।
প্রাকৃতিক ডিটক্স প্রক্রিয়া: মানবদেহে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের করার জন্য দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক অঙ্গ রয়েছে—লিভার (Liver) এবং কিডনি (Kidney)। লিভার টক্সিনগুলিকে কম ক্ষতিকারক পদার্থে রূপান্তরিত করে এবং কিডনি সেগুলিকে রক্ত থেকে ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। রক্তে টক্সিনগুলি এমনভাবে জমা হয় না যে সেগুলিকে কাপিংয়ের মাধ্যমে টেনে বের করা যাবে।
বের হওয়া তরলের প্রকৃতি: হিজামার মাধ্যমে বের হওয়া তরল পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এটি মূলত সাধারণ ভেনাস রক্ত (Venous Blood), আন্তঃকোষীয় তরল (Interstitial Fluid) এবং ছিদ্রযুক্ত রক্তনালী থেকে বেরিয়ে আসা রক্তের অংশ। এই রক্তের উপাদানগত পার্থক্য প্রমাণ করে না যে এটি 'দূষিত' বা 'অস্বাভাবিক'।
সিদ্ধান্ত: এই দাবির পক্ষে বায়োকেমিস্ট্রি বা ফিজিওলজির কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
৩. বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব এবং প্লেসবো প্রভাব (Lack of Evidence and Placebo Effect)
হিজামার কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য উচ্চ-মানের, নিরপেক্ষ র্যান্ডোমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল (RCT)-এর অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ গবেষণা ছোট পরিসরে করা হয়েছে এবং সেগুলির ফলাফল বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ছদ্মবিজ্ঞান: শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে এবং এর মূল দাবির ভুল ব্যাখ্যার কারণে হিজামাকে প্রায়শই ছদ্মবিজ্ঞান বা অপবিজ্ঞান (Pseudoscience) হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্লেসবো প্রভাবের ভূমিকা: অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হিজামার মাধ্যমে রোগী যে আরাম বা ব্যথামুক্তি অনুভব করেন, তার বেশিরভাগই প্লেসবো প্রভাবের কারণে। কাপিংয়ের দৃশ্যমান চিহ্ন (কালশিটে) এবং প্রক্রিয়াটি রোগীর মনে এটি 'কার্যকর' হওয়ার একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাস তৈরি করে, যা নিরাময়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
৪. নিরাপত্তার ঝুঁকি
হিজামার ঝুঁকিগুলি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং গুরুতর:
সংক্রমণ: ভেজা হিজামায় যদি ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলি (বিশেষত ব্লেড বা কাপ) সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত (Sterilized) না করা হয়, তবে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি বা এইচআইভি/এইডস-এর মতো রক্তবাহিত রোগগুলি ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে।
ত্বকের ক্ষতি: কাপিংয়ের ফলে ত্বকে কালশিটে (Bruises), ফোস্কা এবং স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে।
রক্তাল্পতা: নিয়মিত হিজামা করালে দীর্ঘমেয়াদে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতা (Anemia) দেখা দিতে পারে।
উপসংহার: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হিজামাকে একটি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প হিসেবে দেখে, যার কিছু সাময়িক আরামদায়ক বা ব্যথানাশক প্রভাব থাকতে পারে যা স্নায়বিক ও রক্ত সঞ্চালনের সাথে সম্পর্কিত। তবে এর মূল ধারণা 'টক্সিন দূর করা' বৈজ্ঞানিকভাবে মিথ্যা, এবং এর কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য উচ্চ-মানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে। নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে, এই থেরাপি গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং প্রশিক্ষিত পেশাদার নির্বাচন করা অপরিহার্য।
আয়াত ব্লগে নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url